রবীন্দ্র

রবীন্দ্র-নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থান

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ও কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র । এ বছর রবীন্দ্রনাথের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী (৮ মে) এবং নজরুলের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী (২৫ মে) পালিত হবে। তাঁদের স্মরণে বাংলাদেশে তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর তথ্য তুলে আনা হলো।

বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান

শাহজাদপুরের কাচারি বাড়ি

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার দ্বারিয়াপুর গ্রামে অবস্থিত কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কাচারি বাড়িটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দ্বিতল একটি ভবন। কবিগুরুর পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি কেনেন ১৮৪০ সালে। কবিগুরু ১৮৯০ সাল থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত জমিদারি দেখাশুনার জন্য শাহজাদপুরে আসতেন ।

এখানে বসে তিনি লেখেন ‘পোস্ট মাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ও ‘ছিন্ন পত্রাবলী’। ১৯৬৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরে একে স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়। যাতে কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে।

শিলাইদহে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পদ্মার তীরে অবস্থিত শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে সরকারি উদ্যোগে ‘ঠাকুর স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৮০৭ সালে কবিগুরুর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এ জমিদারির মালিক হন। কবি প্রথম শিলাইদহে আসেন ১৮৮৯ সালের নভেম্বরে। কুঠিবাড়িতে বসে ও পদ্মায় বোটে চড়ে কবিগুরু রচনা করেন ‘সোনার তরী’, ‘ক্ষণিকা’, নৈবেদ্য’, ‘খেয়া’ ও ‘গীতাঞ্জলি’। ১৯১২ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেন এখান থেকেই ।

পতিসরে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় নাগর নদীর তীরে অবস্থিত পতিসর গ্রামে অবস্থিত দেশের অন্যতম সংরক্ষিত পুরাকীর্তি রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। ১৮৩০ সালে কবির পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর কালিগ্রাম পরগনাকে তাঁর জমিদারির অন্তর্ভূক্ত করেন। পরগনার সদর দপ্তর ছিল পতিসর। ১৮৯১ সালে পতিসরে প্রথমবার আসার পর থেকে এলাকাটির সঙ্গে কবিগুরু যে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়েন, তার প্রেক্ষিতে ১৯০৫ এখানে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন।

আরো পড়ুন : কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জুন ২০২৪ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ৮ হাজার টাকা তিনি এই ব্যাংকেই বিনিয়োগ করেন। পতিসরে বসে কবি লেখেন ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘বিদায় অভিশাপ’। ১৯৩৭ সালে পতিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় কবিগুরু এস্টেটের সব সম্পদ প্রজাদের মধ্যে দান করে দেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯০ সালে কুঠিবাড়িটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। দোতলা বাড়িটির সামনে রয়েছে নান্দনিক প্রবেশপথ ও কবির আবক্ষ মূর্তি ।

দক্ষিণডিহির রবীন্দ্র কমপ্লেক্স

১৮৮৩ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের বেণীমাধব রায়চৌধুরীর মেয়ে ভবতারিণীর সঙ্গে কবিগুরুর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁর স্ত্রীর নাম রাখা হয় মৃণালিনী। কবিগুরুর মা সারদা সুন্দরী দেবী ও কাকি ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীর জন্মও দক্ষিণডিহি গ্রামে।

১৯৯৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কবিগুরুর শ্বশুরবাড়িতে ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’-এর উদ্বোধন করা হয়। ২০০৬ সালে বাড়িটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখানে রয়েছে বিশ্বকবি ও মৃণালিনীর আবক্ষ মূর্তি ও ‘মৃণালিনী মঞ্চ’। ২০১৬ সালের ১০ মে বাড়িটি ‘রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে স্বীকৃতি পায় ৷

পিঠাভোগে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা

খুলনার রূপসা উপজেলায় ভৈরব নদের তীরে পিঠাভোগ গ্রামে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষদের আদি বাড়ি। এখানে থাকার সময় কবির পূর্বপুরুষদের পদবী ‘কুশারী’ হলেও কলকাতায় তাঁরা ‘ঠাকুর’ পদবি নেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের মার্চ মাসে পিঠাভোগের এই স্থানকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করে। এখানে রয়েছে ‘রবীন্দ্র তোরণ’, উন্মুক্ত মঞ্চে কবির আবক্ষ মূর্তি ও একতলা ভবনে ‘রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা’ ।

বিদ্রোহী কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ

১৯১৪ সালে কিশোর কাজী নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজীর শিমলার দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে কবির স্মৃতিবিজড়িত এই প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে রাখা হয় ‘নজরুল একাডেমি’। ২০০৬ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ ।

২০০৮ সালে নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এখানে নির্মিত হয় ‘নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র’। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় এনে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০ নম্বর বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে থেকে ১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত কবি ওই বাড়িতে ছিলেন। পরবর্তীতে বাড়িটিতে নজরুল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয় ।