General Knowledge

পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশ

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাত
প্রধানত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার মজুত অত্যন্ত সীমিত। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌছানোর মধ্যদিয়ে দেশে এক মাইলফলক রচিত হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

পরমাণুর নিউক্লিয়াসে (কোরে) অবস্থিত আবদ্ধ শক্তিকে পারমাণবিক শক্তি বলে । পরমাণুকে ভেঙ্গে সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আসলে শক্তিটি আসে তাপ শক্তি হিসেবে। এ তাপ শক্তি পানিকে বাষ্পে পরিণত করে । বাষ্প-চাপ টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত এ বিদ্যুৎই পারমাণবিক বিদ্যুৎ। নিউক্লিয়ার ফিশন এবং নিউক্লিয়ার ফিউশন এ দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরমাণুস্থিত নিউক্লিয়াস থেকে এ শক্তি নির্গত হয়ে থাকে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও ইউরেনিয়াম-২৩৫-এ দুই আইসোটোপ ব্যবহৃত হয়। খনিতেপ্রাপ্ত আকরিকে প্রথমটি ৯৯.৩% পরিমাণে থাকলেও দ্বিতীয়টি থাকে মাত্র ০.৭% । চুল্লিতে ফিউশন বিক্রিয়ায় অংশ নেয় মূলত ইউরেনিয়াম-২৩৫। জ্বালানিতে এর পরিমাণ ৫% পর্যন্ত থাকতে হয়। এ জন্য কারখানায় নানা প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়।

নিউক্লিয়ার ফুয়েলের শক্তি অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় অনেক গুণ বেশি। এ ক্ষুদ্র আকারের মাত্র সাড়ে চার গ্রাম ওজনের একটি ইউরেনিয়াম পেলেট যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে তার জন্য কয়লা লাগে ৪০০ কেজি, গ্যাস লাগে ৩৬০ ঘনমিটার। আর ডিজেলের মতো জ্বালানি পোড়াতে হয় ৩৫০ কেজি। অর্থাৎ, এক কেজি নিউক্লিয়ার জ্বালানির সক্ষমতা ৬০ টন জ্বালানি তেল আর ১০০ টন কয়লার সমান ।

পারমাণবিক বিদ্যুতের ইতিহাস

২১ ডিসেম্বর ১৯৫১ প্রথমবার পারমাণবিক চুল্লি থেকে তাপকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। ২৭ জুন ১৯৫৪ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে। ১৭ অক্টোবর ১৯৫৬ যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম ফুল স্কেল পাওয়ার স্টেশন চালু হয়।

১৮ ডিসেম্বর ১৯৫৭ যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় বিশ্বের প্রথম পূর্ণ স্কেল পাওয়ার স্টেশন চালু হয় যা শুধু বিদ্যুৎ পারমাণবিক পাওয়ার স্টেশন গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। বর্তমানে পৃথিবীর ৩৩টি দেশে ৪৪৯টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ মোট উৎপন্ন বিদ্যুতের প্রায় ১২% । পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দেশ যথাক্রমে ফ্রান্স ও চীন ।

পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ

১৯৬১ সালে পাবনা জেলার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৩- ১৯৬৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও অনিবার্য কারণবশত তা বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরপর ১৬ অক্টোবর ১৯৯৭ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০০৯ সালে সরকার ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে ।

এরই ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ার মধ্যে ২ নভেম্বর ২০১১ রূপপুরে দুই ইউনিট বিশিষ্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২২ জুন ২০১৬ রাশিয়া ও বাংলাদেশ পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত Joint Coordinating Committee (JCC)-এর সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট চুক্তি গৃহীত হয়। সর্বশেষ ৩০ নভেম্বর ২০১৭ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।

পারমাণবিক ক্লাবে : ৪ নভেম্বর ২০১৭ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অনুকূলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের Design and Construction License প্রদান করে। এই লাইসেন্স পাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে ‘বিশ্ব পরমাণু ক্লাব’ (নিউক্লিয়ার নেশন)-এ যুক্ত হয় ।

৫ অক্টোবর ২০২৩ রূপপুরে ইউরেনিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের এক অনুষ্ঠান হয়। এটি ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি অনুষ্ঠানে অংশ নেন । আর এর মধ্যদিয়ে ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে নাম লেখায় বাংলাদেশ ।

দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প : দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে মহাঅপচয়ের সাদা হস্তি বলেও অভিহিত করা হয়। এ প্রকল্পে ১,১৩,০৯২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ টাকার ৯১,০৪০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেয় রাশিয়া। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকার বহন করবে।

ঝুঁকি মোকাবিলা : বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। বর্তমান সরকার রাশিয়ার সাথে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে চুক্তি করে তাতে VVER টাইপ রিঅ্যাক্টর পরিবারের সর্বশেষ সংস্করণ স্থাপন করে । ভিভিইআর (VVER) হলো Water Water Energy Reactor এ ধরনের চুল্লির ক্ষেত্রে শীতলক ও মডারেটর হিসেবে পানি ব্যবহার করা হয়।

এটা আসলে Pressurized Water Reactor (PWR )- এর অনুরূপ মডেলের। মানব সম্পদ উন্নয়ন থেকে শুরু করে রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে রিঅ্যাক্টরটি মনুষ্য-সৃষ্ট কোনো দুর্ঘটনা এবং প্রাকৃতিকভাবে ঘটতে পারে এমন যে কোনো প্রকার বিপর্যয় যেমন— শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি মোকাবিলায় সক্ষম থাকবে ।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব : বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বস্তুত দেশের আর্থ- সামাজিক উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ অপরিহার্য। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে। এদিকে ভিশন-২০৪১ তথা উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্নের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে ২০২৪ সালে ১২০০ এবং ২০২৫ সালে আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একটি বেইজলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র যা ২৪ ঘন্টা চলবে। ফলে কলকারখানা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে । প্রত্যাশা এবং পরোক্ষভাবে প্রায় হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ।

পারমাণবিক বিদ্যুতের অসুবিধা

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন । পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনার ফলে ক্যান্সারজনিত রোগের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যেসব স্থানে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে সেসব স্থানে জন্ম নেওয়া সকল শিশুই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। জমির উর্বরতা চিরদিনের জন্য বিনষ্ট হয় ।

পারমাণবিক চুল্লিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার পর সৃষ্টি হয় তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য যা জীবজগৎ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। যতই নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন তার পরেও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমবেশি থেকেই যায়। পারমাণবিক শক্তির প্রধান উৎস ইউরেনিয়াম। বৈজ্ঞানিকদের ধারণা, আগামী ৪০-৬০ বছর পর আর ইউরেনিয়াম পাওয়া যাবে না। যার ফলে পারমাণবিক চুল্লি চালু রাখা হবে খুবই ব্যয়বহুল।

প্রায় অর্ধ-শতাব্দী আগে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় । বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক প্রযুক্তির আর্থিক, কারিগরি ও পরিবেশগত সুবিধাদির বিষয়টি বিবেচনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত। বর্তমান বিশ্বে ঘনবসতিপূর্ণ ও স্বল্প জ্বালানি সম্পদের অধিকারী উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহ তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অন্যতম বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছে। পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ।

FACT FILE

  • প্রকল্পের নাম : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প
  • প্রতিষ্ঠা : ১৯৬১ সাল
  • আয়তন : ১,০৬২ একর
  • অবস্থান : পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামে
  • যে নদীর তীরে অবস্থান : পদ্মা
  • যে মন্ত্রণালয়ের অধীন : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
  • নির্মাণকারী : রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশন
  • তত্ত্বাবধানে : বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC)
  • বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাইট লাইসেন্স প্রদান : ২১ জুন ২০১৬
  • পরিচালনায় : নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (NPCBL)
  • অর্থায়ন : রাশিয়া ও বাংলাদেশ
  • একনেকে অনুমোদন : ৬ ডিসেম্বর ২০১৬
  • নির্মাণকাজ উদ্বোধন : ৩০ নভেম্বর ২০১৭
  • উৎপাদন ক্ষমতা : ২৪০০ মেগাওয়াট
  • ইউনিট : ২ টি
  • প্রথম রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল উদ্বোধন : ১০ অক্টোবর ২০২১
  • দ্বিতীয় রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল উদ্বোধন : ১৯ অক্টোবর ২০২২
  • পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান : বাররুস প্রজেক্ট এলসিসি
  • সম্ভাব্য পরীক্ষামূলক উৎপাদন : সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • বাণিজ্যিক উৎপাদন : ২০২৫ সালে ।