আখিরাতের প্রতি ইমান

Estimated reading: 1 minute 13 views

প্রিয় শিক্ষার্থী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ইমানের মৌলিক সাতটি বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং সে শ্রেণিতে আখিরাত জীবনের স্তরগুলো সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। তারপর, সপ্তম শ্রেণিতে ইমানের সাতটি বিষয়ের মধ্যে আল্লাহর প্রতি ইমান, ফেরেশতাগণের প্রতি ইমান এবং কিতাবসমূহের প্রতি ইমান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় অষ্টম শ্রেণিতে রাসুলগণের প্রতি ইমান এবং আখিরাতের প্রতি ইমান শিরোনামের আওতায় কিয়ামত, পুনরুত্থান এবং হাশর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া সে শ্রেণিতে তাকদিরের প্রতি ইমান এবং শাফা’আত সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান শ্রেণিতে আখিরাতের প্রতি ইমান শিরোনামের আওতায় আমরা আখিরাত জীবনেরই অংশ জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

জান্নাত

জান্নাত আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ বাগান, উদ্যান, নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, সৎকর্মশীলদের চূড়ান্ত আবাসস্থল। ইসলামি পরিভাষায়, আখিরাতে ইমানদার ও নেককার বান্দাদের জন্য যে চিরশান্তির আবাসস্থল তৈরি করে রাখা হয়েছে, তাকে জান্নাত বলা হয়। জান্নাতিরা যা কিছু কামনা করবে, সেখানে তার সব কিছুই পাবে। জান্নাত হলো এমন জায়গা, যেখানে বান্দার কোনো চাওয়াই অপূর্ণ থাকবে না। আল-কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন—

وَلَكُمْ فِيْهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيْهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِنْ غَفُوْرٍ رَّحِيمٍ

অর্থ: সেখানে (জান্নাতে) তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা আকাঙ্ক্ষা কর। এটি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন। (সূরা হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত: ৩১-৩২)

আল-কুরআনে আটটি জান্নাতের নাম পাওয়া যায়। কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের নামসমূহ:

  • জান্নাতুল ফিরদাউস
  • দারুল মাকাম
  • দারুল কারার
  • দারুস সালাম
  • জান্নাতুল মাওয়া
  • জান্নাতুন নাঈম
  • দারুল খুলদ
  • জান্নাতু আদন

এ আটটি জান্নাতের মধ্যে জান্নাতুল ফিরদাউস হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।

জান্নাত এক চিরন্তন শান্তির আবাসস্থল। জান্নাতিরা সেখানে কখনো কোনো দুঃখ-কষ্ট ও ক্লান্তির সম্মুখীন হবে না। সেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে। মৃত্যু কখনো তাদেরকে স্পর্শ করবে না। তাদের পোশাক পুরাতন হবে না এবং তারুণ্যও কোনোদিন শেষ হবে না। তারা সেখানে চিরস্থায়ী নিয়ামত ও সুখ-শান্তিতে থাকবে। সেখানে তারা কোনো অপ্রয়োজনীয়, অশালীন ও মিথ্যা কথা শুনবে না। তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারাও তাদের সঙ্গে থাকবে। ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে এবং বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম’। আখিরাতের এ জীবন কতই না উত্তম!

জান্নাতের সবকিছুই অনিন্দ্য সুন্দর ও পরম আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা সুসজ্জিত। এর ঘর-বাড়ি, আসন, আসবাবপত্র সবকিছু স্বর্ণ-রৌপ্য, মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত। সেখানে থাকবে অসংখ্য বাগান। খেজুর, আঙ্গুর আর থোকা-থোকা অপূর্ব সব ফলের সমাহার থাকবে। এমন সুস্বাদু ফল, যার স্বাদ কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না। সারি সারি পান-পাত্রে রাখা থাকবে অমৃত সুধা জান্নাতে মোট চার ধরনের নদী বা নহর প্রবাহিত রয়েছে। এগুলো হলো নির্মল পানির নহর, দুধের নহর, পবিত্র পানীয়র নহর এবং মধুর নহর। এ সকল নদী বা নহর ছাড়াও আরো তিন ধরনের ঝরনা জান্নাতে চিরকাল প্রবাহিত থাকবে। সেগুলো হলো-

  • ‘কাফুর’ নামক ঝরনা, যার পানি সুগন্ধময় ও সুশীতল।
  • ‘সালসাবিল’ নামক ঝরনা, যার পানি সুগন্ধময় ও উত্তপ্ত থাকবে।
  • ‘তাসনিম’ নামক ঝরনা, যার পানি থাকবে নাতিশীতোষ্ণ।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুত্তাকিদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হলো, তাতে আছে নির্মল পানির নহর, আছে দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু পানীয়র নহর, আছে পরিশোধিত মধুর নহর এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল।’ (সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৫) জান্নাতিরা দুই ভাগে বিভক্ত হবে। ডান দিকের লোক এবং অগ্রবর্তী লোক। ডান দিকের লোকেরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। আর অগ্রবর্তী লোকেরা তো সকল ব্যাপারে অগ্রবর্তী। তারাই হবে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে একশ’টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দুটি স্তরের ব্যবধান আসমান ও জমিনের দূরত্বের মতো। তোমরা আল্লাহর কাছে চাইলে ফিরদাউস চাইবে। কেননা, এটিই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। এর উপরে রয়েছে রহমানের আরশ। আর সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে।’ (বুখারি)

মুত্তাকিদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা সেখানে পৌঁছাবেন, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে। আর জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবেন, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং ইসলাম শিক্ষা চিরস্থায়ী বাসস্থান জান্নাতে প্রবেশ করো।” তারা বলবেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের প্রতি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এ ভূমির উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা বসবাস করবো।’ সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম।

জান্নাতিরা স্বর্ণের সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবেন। সেখানে তাঁরা রোদের তাপ ও শীতের ঠাণ্ডা অনুভব করবেন না। গাছের ছায়া তাদের ওপর ঝুঁকে থাকবে এবং ফলগুলো তাদের আয়ত্তে রাখা হবে। স্বর্ণ ও রূপায় নির্মিত স্বচ্ছ স্ফটিকের পানপাত্রে তাদের জন্য পানীয় পরিবেশন করা হবে। সেখানে তাদেরকে পান করানো হবে, ‘যানজাবিল’ মিশ্রিত পানপাত্র থেকে। এটা জান্নাতে অবস্থিত ‘সালসাবিল’ নামক একটি ঝরনা। তারা যেদিকেই তাকাবেন দেখতে পাবে নিয়ামতরাজি আর বিশাল রাজ্য। তাঁদের পোশাক হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা সবুজ রেশমের। তাঁদের অলংকার হবে রূপার কঙ্কণ আর তাদের পালনকর্তা তাদেরকে পান করাবেন ‘শরাবান- তহুরা’।

মুত্তাকিরা থাকবেন উদ্যান ও ঝরনার মাঝে। তাঁদের রব তাঁদেরকে যা দেবে সানন্দে তাঁরা তা গ্রহণ করতে থাকবেন। সেখানে রয়েছে কাঁটাহীন কুলগাছ, সারি সারি সাজানো কলাগাছ, বিস্তৃত ছায়া, সর্বদা প্রবহমান পানি আর রঙ-বেরঙের নানা প্রজাতির পাখি। আর থাকবে প্রচুর পরিমাণে ফলমূল; যা কখনো শেষ হবে না এবং কখনো নিষিদ্ধও হবে না। নেক বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন নিয়ামত তৈরি করে রাখা হয়েছে, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, এমনকি কোনো মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন—

فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِى لَهُمْ مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ 

অর্থ: কেউই জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাঁদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরুপ! (সূরা আস-সাজদা, আয়াত: ১৭)

পুণ্যবান লোকেরা থাকবেন অফুরন্ত নিয়ামতের মাঝে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা ছায়ার মধ্যে স্বর্ণের আসনে হেলান দিয়ে বসবেন। তাদের সামনে চক্রাকারে সোনার থালা ও পান পাত্র পরিবেশন করা হবে। সেখানে থাকবে মন ভোলানো ও চোখ জুড়ানো জিনিস। তাঁরা পান করবেন অতি উৎকৃষ্ট পানীয়, যার মিশ্রণ হবে কাফুর। আল্লাহর বান্দারা এমন এক ঝরনা থেকে পান করবেন, যা তাঁরা ইচ্ছেমতো প্রবাহিত করবেন। আর তাঁদের জন্য সেখানে থাকবে সব রকমের ফলমূল, পাখির মাংস এবং যা তাঁরা চাইবেন। তাঁরা চারদিকে সবকিছু দেখতে থাকবেন। তাঁদের চেহারায় থাকবে প্রশান্তির উজ্জ্বলতা। বলা হবে, ‘তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে’।

জাহান্নাম

জাহান্নাম আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে, শাস্তির স্থান, দুঃখময় স্থান, নিকৃষ্টতম স্থান, দুর্গন্ধময় স্থান ইত্যাদি। জাহান্নাম গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিপদসংকুল, অতি সংকীর্ণ এক নিকৃষ্ট স্থান। সব সময় এতে আগুন প্রজ্বলিত থাকবে। এটি পাপীদের আবাসস্থল।
জাহান্নামের সাতটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দল নির্ধারিত আছে। জাহান্নামের সাতটি স্তরের নাম হচ্ছে-

  • হাবিয়া
  • জাহিম
  • সাকার
  • লাযা
  • সাঈর
  • হুতামাহ
  • জাহান্নাম

পাপের ধরন অনুযায়ী পাপীরা বিভিন্ন স্তরে শাস্তি ভোগ করবে। তারা সেখানে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে। জাহান্নামিদের অবস্থা হবে চূড়ান্ত অপমানজনক আর শোচনীয় পরাজয়ের। পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাব ও ভয়ংকর চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতাগণ জাহান্নামের রক্ষী হবেন। যাদের চেহারা দর্শনও শাস্তির ওপর অতিরিক্ত শাস্তি হিসেবে গণ্য হবে। সর্বনিকৃষ্ট জাহান্নাম হাবিয়া

জাহান্নাম এক গভীর আগুনের গর্ত। পাপীদের সেখানে নিক্ষেপ করা হবে। তাদের ৭০ হাত দীর্ঘ শিকল দিয়ে বাঁধা হবে। তাদের জন্য সেখানে রয়েছে বিষধর সাপের দংশন আর জ্বলন্ত আগুন। তাদের কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ করা হবে না। তাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। তারা চিৎকার করবে আর মৃত্যুকে আহ্বান করতে থাকবে। তাদের বলা হবে- ‘আজ তোমরা এক মৃত্যুকে ডেকো না, অনেক মৃত্যুকে ডাকো।’ তখন তারা বলবে, ‘হায় আফসোস! যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামি হতাম না। নিশ্চয়ই জাহান্নাম সমস্ত দিক থেকে কাফিরদের বেষ্টন করে রাখবে।

তাদের নিচে থাকবে আগুনের বিছানা আর ওপরে থাকবে আগুনের চাদর। যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখনই অন্য চামড়া দিয়ে তা পাল্টে দেওয়া হবে। সেখান থেকে কোথাও পালাবার জায়গা থাকবে না। বলা হবে– “তোমরা শাস্তি আস্বাদন করো। তোমাদের জন্য শাস্তি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করা হবে না।’ তারা জাহান্নামের রক্ষীদের বলবে, “তোমরা তোমাদের রবকে বলো, তিনি যেন আমাদের থেকে এক দিনের আযাব হালকা করে দেন।’ রক্ষীরা বলবে: ‘তোমাদের কাছে কি সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে তোমাদের রাসুলগণ আসেনি?” তারা বলবে: ‘অবশ্যই এসেছিল’; তখন তারা বলবে: ‘তবে তোমরাই আহ্বান করো।’ আর কাফিরদের আহ্বান কোনো কাজে আসবে না।

জাহান্নামিদের পোশাক হবে আগুনের। তাদের মুখমণ্ডল আগুনে দগ্ধ হবে আর চেহারা হবে বীভৎস। মাথার ওপর গরম পানি ঢালা হবে। চামড়া ও উদরে যা আছে তা গলে যাবে। আর তাদের লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হবে। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে যখনই তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে আবার তাতে ঠেলে দেওয়া হবে।

জাহান্নামিদের খাবার হবে যাক্কুম নামক কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ। তাদের পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধার সৃষ্টি হবে। তারা খাবারের জন্য ফরিয়াদ করতে থাকবে। তখন তাদেরকে যাক্কুম খেতে দেওয়া হবে। যাক্কুম ভক্ষণের ফলে তা গলিত তামার মতো পেটে ফুটতে থাকবে। মনে হবে যেন ফুটন্ত পানি। যাক্কুম গাছ আরবের তিহামা অঞ্চলে জন্মে। এর স্বাদ তিক্ত, গন্ধ অসহ্য। এ গাছ থেকে দুধের মতো সাদা কষ বের হয়, যা গায়ে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফোসকা পড়ে ঘা সৃষ্টি হয় এবং ফুলে ওঠে। পৃথিবীর যাক্কুম গাছের তুলনায় আখিরাতের যাক্কুম গাছ অতি নিকৃষ্ট ও বিষাক্ত। নবি কারীম (সা.) বলেন; ‘যদি যাক্কুমের এক ফোঁটা কষ পৃথিবীতে পড়ে, তবে তা সারা বিশ্বের প্রাণিকুলের খাদ্যবস্তুকে বিকৃত করে ফেলবে। সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে, যার খাদ্যই হবে যাক্কুম’? (তিরমিযি)

জাহান্নামে পান করার জন্য আছে টগবগে ফুটন্ত পানি ও গলিত পুঁজ। জাহান্নামিরা প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ছটফট করে পানির জন্য ফরিয়াদ করতে থাকবে। তাদেরকে এমন পানি দেওয়া হবে, যা তাদের নিকটবর্তী করা হলে তাদের চেহারা জ্বলে যাবে। তারা তৃষ্ণার্ত উটের মতো টগবগে ফুটন্ত পানি পান করবে। আর যখনই তারা তা পান করবে, তখনই তাদের নাড়ি-ভুঁড়ি গলে মলদ্বার দিয়ে বের হয়ে যাবে।

জাহান্নামিরা জান্নাতবাসীদের ডেকে বলবে, ‘আমাদেরকে একটু পানীয় বস্তু দাও, অথবা আল্লাহর পক্ষ হতে যে রিযিকপ্রাপ্ত হয়েছ, তা হতে সামান্য আমাদের দিকে নিক্ষেপ করো। তখন জান্নাতবাসীরা বলবেন, ‘এ দুই জিনিসই মহান আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন।’ জান্নাতিরা জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করবে, ‘কীসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করালো?” তারা বলবে, ‘আমরা সালাত আদায়কারী ছিলাম না। আর মিসকিনদের খাবার খাওয়াতাম না।”

জাহান্নামের জ্বালানি হবে মানুষ, জ্বিন ও পাথর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে তোমরা সে আগুনকে ভয় করো, মানুষ ও পাথর হবে যার ইন্ধন, কাফিরদের জন্য যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪) নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকেও বাঁচানোর জন্য মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো আগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬)

একটু চিন্তা করো সেই জগতের কথা, যখন জাহান্নামিরা সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মৃত্যু কামনা করবে। সর্বদিক থেকে তাদের কাছে আসবে মৃত্যু, অথচ তারা মরবে না। তারা জাহান্নামের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাকে ডেকে বলবে, “হে মালেক! তোমার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন।’ তাদেরকে বলা হবে, “নিশ্চয় তোমরা এখানে চিরকাল অবস্থান করবে। তোমরা ধিকৃত ও নিন্দিত অবস্থায় এখানেই পড়ে থাকো। কোনো কথা বলো না।’ এ কথা শোনার পর নৈরাশ্য আর হতাশা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে নেবে। রুদ্ধ হয়ে যাবে তাদের কণ্ঠ, বন্ধ হয়ে যাবে তাদের সকল কথোপকথন। শুধু চিৎকার, আর্তনাদ আর কান্নার শব্দ সর্বত্র ভেসে বেড়াবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে কালো মেষ আকৃতিতে জান্নাত-জাহান্নামের মাঝখানে হাজির করা হবে। অতঃপর বলা হবে, হে জান্নাতবাসী! তোমরা একে চেনো? তারা উঁকি দিয়ে তাকাবেন এবং বলবেন, হ্যাঁ, এ হলো মৃত্যু। এরপর তাকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হবে। অতঃপর বলা হবে, হে জান্নাতিগণ, তোমরা চিরস্থায়ী, আর মুত্যু নেই। হে জাহান্নামিরা! তোমরা এখানেই চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এ দুনিয়ার জীবনের পর, আখিরাত জীবন জান্নাত-জাহান্নাম ভিন্ন অন্য কোনো স্থান নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের প্রত্যেককেই জাহান্নামের ওপর স্থাপিত পুলসিরাত দিয়ে পথ অতিক্রম করে ওপারে যেতে হবে। তবে সে-ই ভাগ্যবান যে এর থেকে মুক্তি পাবে। আল-কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকিগণকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেবো।’ (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১-৭২)

Leave a Comment